ধানের সাথে মাছ ও চিংড়ি চাষের জন্য উপযুক্ত ধানের জাত
বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে একটি বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন এসেছে একই জমিতে ধান, মাছ ও চিংড়ির সমন্বিত চাষাবাদের মাধ্যমে। এই আধুনিক পদ্ধতি শুধুমাত্র কৃষকদের আয় বৃদ্ধি করছে না, বরং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় বিশেষত সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী এবং বরগুনা জেলায় এই পদ্ধতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে সফলতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক ধানের জাত নির্বাচন। কেননা সব ধানের জাত লবণাক্ত পানি এবং মাছ-চিংড়ির সাথে সহাবস্থানের জন্য উপযুক্ত নয়।
কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, সঠিক জাত নির্বাচনের মাধ্যমে একই জমি থেকে প্রতি হেক্টরে ৪-৫ টন ধান, ৮০০-১২০০ কেজি মাছ এবং ৩০০-৫০০ কেজি চিংড়ি উৎপাদন সম্ভব। এই লেখায় আমরা বিস্তারিতভাবে জানব কোন ধানের জাতগুলো এই সমন্বিত চাষাবাদের জন্য সর্বোত্তম এবং কেন।
সমন্বিত চাষাবাদের গুরুত্ব ও সুবিধা
অর্থনৈতিক সুবিধা
সমন্বিত চাষাবাদ পদ্ধতি কৃষকদের জন্য একটি বহুমুখী আয়ের উৎস তৈরি করে। ঐতিহ্যগত ধান চাষে যেখানে একজন কৃষক প্রতি বিঘায় ১৫,০০০-২০,০০০ টাকা আয় করতে পারেন, সেখানে সমন্বিত চাষে এই আয় বৃদ্ধি পেয়ে ৪০,০০০-৫৫,০০০ টাকায় দাঁড়ায়। এই বৃদ্ধির মূল কারণ হলো একসাথে তিনটি ফসল উৎপাদন।
মাছ ও চিংড়ির বাজারদর সাধারণত ধানের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে রুই, কাতলা, মৃগেল মাছের দাম ২৫০-৩৫০ টাকা প্রতি কেজি এবং চিংড়ির দাম ৮০০-১২০০ টাকা প্রতি কেজি। অন্যদিকে ধানের দাম ৩০-৪৫ টাকা প্রতি কেজি।
পরিবেশগত সুবিধা
এই পদ্ধতিতে কৃত্রিম সার ও কীটনাশকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। মাছ ও চিংড়ির মলমূত্র ধানের জন্য প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করে। একই সাথে মাছ ধানের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে জৈবিক কীটনাশকের ভূমিকা পালন করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সমন্বিত চাষাবাদে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ৩০-৪০% এবং কীটনাশকের ব্যবহার ৫০-৬০% কমে যায়। এতে মাটির স্বাস্থ্য উন্নত হয় এবং পরিবেশ দূষণ কমে।
খাদ্য নিরাপত্তা
একই জমি থেকে প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট উভয় ধরনের খাদ্য উৎপাদন হওয়ায় পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান বৃদ্ধি পায়। বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় যেখানে প্রোটিনের অভাব রয়েছে, সেখানে এই পদ্ধতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
ধানের জাত নির্বাচনের মূল বিষয়সমূহ
লবণাক্ততা সহনশীলতা
উপকূলীয় এলাকায় মাটি ও পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেশি থাকে। সমুদ্রের কাছাকাছি এলাকায় এই মাত্রা ৪-১২ ডেসিসিমেন্স প্রতি মিটার (dS/m) পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণ ধানের জাত ৪ dS/m এর বেশি লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে না।
লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাতগুলো বিশেষ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অতিরিক্ত লবণ নিঃসরণ করতে পারে। এই জাতগুলোর পাতায় বিশেষ গ্রন্থি থাকে যা লবণ নিঃসরণে সাহায্য করে।
জলমগ্নতা সহনশীলতা
মাছ ও চিংড়ি চাষের জন্য জমিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি রাখতে হয়। সাধারণত ৩০-৬০ সেন্টিমিটার গভীর পানি প্রয়োজন হয়। এই পানিতে ধান গাছের অর্ধেক বা তার বেশি অংশ ডুবে থাকে।
জলমগ্নতা সহনশীল ধানের জাতগুলোর কাণ্ডে বিশেষ বায়ু কলা (aerenchyma) থাকে যা শিকড় পর্যন্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে সাহায্য করে। এছাড়া এই জাতগুলোর পাতার অগ্রভাগ পানির উপরে থাকে বলে সালোকসংশ্লেষণ ব্যাহত হয় না।
চাষাবাদ সময়কাল
সমন্বিত চাষাবাদে সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী জাত ব্যবহার করা হয়। কারণ মাছ ও চিংড়ির পূর্ণ বৃদ্ধির জন্য ১২০-১৫০ দিন সময় লাগে। তাই ধানের জাতও যেন এই সময়কালের মধ্যে পরিপক্ক হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়।
উৎপাদনশীলতা
সমন্বিত চাষাবাদে ধানের উৎপাদনশীলতা কিছুটা কমে যেতে পারে। কারণ পানির গভীরতা বেশি থাকায় এবং মাছের নড়াচড়ার কারণে গাছের কিছু ক্ষতি হতে পারে। তাই এমন জাত নির্বাচন করতে হবে যা এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ভালো ফলন দিতে পারে।
লবণাক্ততা সহনশীল উপযুক্ত জাতসমূহ
বিনাধান-৮
বিনাধান-৮ হলো বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) কর্তৃক উদ্ভাবিত একটি অত্যাধুনিক লবণাক্ততা সহনশীল জাত। এই জাতটি ১২ ডেসিসিমেন্স প্রতি মিটার পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে।
বৈশিষ্ট্য:
- জীবনকাল: ১৪৫-১৫৫ দিন
- গড় উৎপাদন: ৪.৫-৫.৫ টন প্রতি হেক্টর
- গাছের উচ্চতা: ৯৫-১০৫ সেন্টিমিটার
- দানার রং: সাদা, মাঝারি মোটা
- প্রোটিন: ৮.৫-৯.৫%
এই জাতের বিশেষত্ব হলো এর শক্তিশালী শিকড় ব্যবস্থা যা গভীর পানিতেও গাছকে স্থিতিশীল রাখে। বিনাধান-৮ এর পাতা চওড়া ও মজবুত হওয়ায় সালোকসংশ্লেষণ ভালো হয় এবং ফলন বৃদ্ধি পায়।
বিনাধান-১০
বিনাধান-১০ আরেকটি উন্নত লবণাক্ততা সহনশীল জাত যা বিশেষভাবে উপকূলীয় এলাকার জন্য উপযুক্ত। এই জাতটি ৮-১০ ডেসিসিমেন্স প্রতি মিটার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে।
বৈশিষ্ট্য:
- জীবনকাল: ১৪০-১৫০ দিন
- গড় উৎপাদন: ৪.০-৫.০ টন প্রতি হেক্টর
- গাছের উচ্চতা: ৯০-১০০ সেন্টিমিটার
- দানার রং: সাদা, সরু
- প্রোটিন: ৯.০-১০.০%
বিনাধান-১০ এর দানার গুণমান খুবই ভালো এবং ভাতের স্বাদ চমৎকার। এই জাতটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি এবং বাদামী গাছ ফড়িং ও ব্যাকটেরিয়াল ব্লাইট রোগ প্রতিরোধী।
বিআর৪৭
বিআর৪৭ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) কর্তৃক উদ্ভাবিত একটি লবণাক্ততা সহনশীল জাত। এই জাতটি ৬-৮ ডেসিসিমেন্স প্রতি মিটার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে।
বৈশিষ্ট্য:
- জীবনকাল: ১৩৫-১৪৫ দিন
- গড় উৎপাদন: ৪.৫-৫.২ টন প্রতি হেক্টর
- গাছের উচ্চতা: ৯৫-১০৫ সেন্টিমিটার
- দানার রং: সাদা, মাঝারি মোটা
- প্রোটিন: ৮.৮-৯.৮%
বিআর৪৭ এর কুশির সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রতি বর্গমিটারে অধিক সংখ্যক শিষ পাওয়া যায়। এর ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
বিআর৪০
বিআর৪০ একটি সুপরিচিত লবণাক্ততা সহনশীল জাত যা দীর্ঘদিন ধরে উপকূলীয় এলাকায় চাষ হচ্ছে। এই জাতটি ৪-৬ ডেসিসিমেন্স প্রতি মিটার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে।
বৈশিষ্ট্য:
- জীবনকাল: ১৪৫-১৫৫ দিন
- গড় উৎপাদন: ৩.৫-৪.৫ টন প্রতি হেক্টর
- গাছের উচ্চতা: ১০০-১১০ সেন্টিমিটার
- দানার রং: সাদা, মাঝারি মোটা
- প্রোটিন: ৮.২-৯.২%
বিআর৪০ এর অভিযোজন ক্ষমতা অত্যন্ত ভালো এবং বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারে।
জলমগ্নতা সহনশীল জাতসমূহ
বিআর২৩ (দশমিনা)
বিআর২৩ বা দশমিনা বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী জাত যা গভীর পানিতে চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযুক্ত। এই জাতটি ১-২ মিটার গভীর পানিতেও ভালো জন্মাতে পারে।
বৈশিষ্ট্য:
- জীবনকাল: ১৫৫-১৬৫ দিন
- গড় উৎপাদন: ৩.০-৪.০ টন প্রতি হেক্টর
- গাছের উচ্চতা: ১৫০-২০০ সেন্টিমিটার
- দানার রং: সাদা, লম্বা ও সরু
- প্রোটিন: ৮.০-৯.০%
দশমিনার বিশেষত্ব হলো এর কাণ্ড পানির গভীরতা অনুযায়ী লম্বা হতে পারে। এই জাতটি সুগন্ধযুক্ত এবং ভাতের স্বাদ চমৎকার।
বিআর৫১
বিআর৫১ একটি উন্নত জলমগ্নতা সহনশীল জাত যা মাঝারি গভীর পানিতে ভালো জন্মায়। এই জাতটি ৫০-৮০ সেন্টিমিটার গভীর পানিতে চাষ করা যায়।
বৈশিষ্ট্য:
- জীবনকাল: ১৪০-১৫০ দিন
- গড় উৎপাদন: ৪.০-৪.৮ টন প্রতি হেক্টর
- গাছের উচ্চতা: ১২০-১৪০ সেন্টিমিটার
- দানার রং: সাদা, মাঝারি মোটা
- প্রোটিন: ৮.৫-৯.৫%
বিআর৫১ এর কুশির সংখ্যা বেশি এবং শিষ প্রতি দানার সংখ্যাও বেশি। এর ফলে উৎপাদন ভালো হয়।
স্বর্ণা
স্বর্ণা একটি অত্যাধুনিক জলমগ্নতা সহনশীল জাত যা আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) এর সহায়তায় উদ্ভাবিত হয়েছে। এই জাতটি ১৪ দিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ জলমগ্ন অবস্থায় থাকতে পারে।
বৈশিষ্ট্য:
- জীবনকাল: ১৪৫-১৫৫ দিন
- গড় উৎপাদন: ৪.৫-৫.৫ টন প্রতি হেক্টর
- গাছের উচ্চতা: ১০৫-১১৫ সেন্টিমিটার
- দানার রং: সাদা, মাঝারি মোটা
- প্রোটিন: ৯.০-১০.০%
স্বর্ণার বিশেষ জিন (Sub1A) রয়েছে যা জলমগ্ন অবস্থায় গাছের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে এবং অক্সিজেনের অভাবে গাছ মরে যাওয়া প্রতিরোধ করে।
উৎপাদনশীল হাইব্রিড জাতসমূহ
হীরা-৪
হীরা-৪ একটি উচ্চ উৎপাদনশীল হাইব্রিড জাত যা লবণাক্ততা ও জলমগ্নতা উভয়ই সহ্য করতে পারে। এই জাতটি বিশেষভাবে সমন্বিত চাষাবাদের জন্য উপযুক্ত।
বৈশিষ্ট্য:
- জীবনকাল: ১৪০-১৫০ দিন
- গড় উৎপাদন: ৫.৫-৬.৫ টন প্রতি হেক্টর
- গাছের উচ্চতা: ১১০-১২০ সেন্টিমিটার
- দানার রং: সাদা, মাঝারি মোটা
- প্রোটিন: ৯.৫-১০.৫%
হীরা-৪ এর কুশির সংখ্যা অত্যন্ত বেশি এবং প্রতি শিষে ১৮০-২২০টি দাসারাhave থাকে। এর ফলে উৎপাদন অনেক বেশি হয়।
আলোক-৬২০১
আলোক-৬২০১ একটি নতুন প্রজন্মের হাইব্রিড জাত যা বিশেষভাবে উপকূলীয় এলাকার জন্য উন্নত করা হয়েছে। এই জাতটি ৮ ডেসিসিমেন্স প্রতি মিটার পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে।
বৈশিষ্ট্য:
- জীবনকাল: ১৩৫-১৪৫ দিন
- গড় উৎপাদন: ৫.০-৬.০ টন প্রতি হেক্টর
- গাছের উচ্চতা: ১০০-১১০ সেন্টিমিটার
- দানার রং: সাদা, মাঝারি মোটা
- প্রোটিন: ৯.০-১০.০%
আলোক-৬২০১ এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই ভালো এবং বিশেষভাবে ব্যাকটেরিয়াল ব্লাইট ও বাদামী গাছ ফড়িং প্রতিরোধী।
স্থানীয় জাত ও তাদের বৈশিষ্ট্য
কালিজিরা
কালিজিরা বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী সুগন্ধি জাত যা উপকূলীয় এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চাষ হচ্ছে। এই জাতটি মাঝারি লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে।
বৈশিষ্ট্য:
- জীবনকাল: ১৫০-১৬০ দিন
- গড় উৎপাদন: ২.৫-৩.৫ টন প্রতি হেক্টর
- গাছের উচ্চতা: ১৩০-১৫০ সেন্টিমিটার
- দানার রং: কালো, ছোট ও সরু
- প্রোটিন: ১০.০-১২.০%
কালিজিরার দানা ছোট ও কালো রঙের হলেও এর পুষ্টিগুণ অত্যন্ত বেশি। এই চালে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও মিনারেল রয়েছে।
চিনিগুড়া
চিনিগুড়া একটি সুগন্ধি স্থানীয় জাত যা বিশেষভাবে উত্তর বাংলায় জনপ্রিয়। তবে এই জাতটি লবণাক্ত পানিতেও ভালো জন্মাতে পারে।
বৈশিষ্ট্য:
- জীবনকাল: ১৪৫-১৫৫ দিন
- গড় উৎপাদন: ৩.০-৪.০ টন প্রতি হেক্টর
- গাছের উচ্চতা: ১২০-১৪০ সেন্টিমিটার
- দানার রং: সাদা, ছোট ও সরু
- প্রোটিন: ৮.৫-৯.৫%
চিনিগুড়ার ভাতের সুগন্ধ অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং স্বাদ চমৎকার। এই জাতের চাল বাজারে উচ্চ দামে বিক্রি হয়।
তুলশীমালা
তুলশীমালা একটি ঐতিহ্যবাহী সুগন্ধি জাত যা বিশেষভাবে পূর্ব বাংলায় জনপ্রিয়। এই জাতটি মাঝারি লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে।
বৈশিষ্ট্য:
- জীবনকাল: ১৪০-১৫০ দিন
- গড় উৎপাদন: ২.৮-৩.৮ টন প্রতি হেক্টর
- গাছের উচ্চতা: ১১৫-১৩৫ সেন্টিমিটার
- দানার রং: সাদা, মাঝারি সরু
- প্রোটিন: ৮.৮-৯.৮%
তুলশীমালার দানা লম্বা ও সরু এবং ভাত রান্নার পর ফুলে উঠে। এই জাতের চাল রপ্তানি মানের।
বিভিন্ন এলাকার জন্য উপযুক্ত জাত
সাতক্ষীরা-খুলনা অঞ্চলের জন্য
সাতক্ষীরা ও খুলনা অঞ্চলে লবণাক্ততার মাত্রা সবচেয়ে বেশি। এই এলাকায় নিম্নলিখিত জাতগুলো সবচেয়ে উপযুক্ত:
প্রথম পছন্দ:
- বিনাধান-৮ (১২ dS/m পর্যন্ত সহনশীল)
- বিনাধান-১০ (১০ dS/m পর্যন্ত সহনশীল)
দ্বিতীয় পছন্দ:
- বিআর৪৭ (৮ dS/m পর্যন্ত সহনশীল)
- হীরা-৪ (৬ dS/m পর্যন্ত সহনশীল)
এই এলাকায় চিংড়ি চাষই মূল উদ্দেশ্য হওয়ায় লবণাক্ততা সহনশীলতাকে প্রাধান্য দিতে হয়।
বরিশাল-পটুয়াখালী অঞ্চলের জন্য
বরিশাল ও পটুয়াখালী অঞ্চলে লবণাক্ততার মাত্রা মাঝারি এবং বন্যার সমস্যা বেশি। এই এলাকায় নিম্নলিখিত জাতগুলো উপযুক্ত:
প্রথম পছন্দ:
- স্বর্ণা (জলমগ্নতা সহনশীল)
- বিআর৫১ (মাঝারি গভীর পানি সহনশীল)
দ্বিতীয় পছন্দ:
- বিআর৪০ (মাঝারি লবণাক্ততা সহনশীল)
- আলোক-৬২০১ (উৎপাদনশীল হাইব্রিড)
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলের জন্য
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে পাহাড়ি এলাকার কারণে পানির গুণমান ভালো। এই এলাকায় নিম্নলিখিত জাতগুলো উপযুক্ত:
প্রথম পছন্দ:
- বিআর৪৭ (ভালো উৎপাদন ও গুণমান)
- হীরা-৪ (উচ্চ উৎপাদনশীল)
দ্বিতীয় পছন্দ:
- চিনিগুড়া (সুগন্ধি ও বাজারমূল্য বেশি)
- তুলশীমালা (রপ্তানি মানের)
জাত নির্বাচনের তুলনামূলক পর্যালোচনা
| জাতের নাম | লবণাক্ততা সহনশীলতা (dS/m) | জলমগ্নতা সহনশীলতা | জীবনকাল (দিন) | উৎপাদন (টন/হেক্টর) | বাজারমূল্য |
|---|---|---|---|---|---|
| বিনাধান-৮ | ১২ | মাঝারি | ১৪৫-১৫৫ | ৪.৫-৫.৫ | ভালো |
| বিনাধান-১০ | ১০ | মাঝারি | ১৪০-১৫০ | ৪.০-৫.০ | ভালো |
| বিআর৪৭ | ৮ | ভালো | ১৩৫-১৪৫ | ৄ.৫-৫.২ | ভালো |
| বিআর৪০ | ৬ | ভালো | ১৪৫-১৫৫ | ৩.৫-৪.৫ | মাঝারি |
| স্বর্ণা | ৪ | অত্যন্ত ভালো | ১৪৫-১৫৫ | ৪.৫-৫.৫ | ভালো |
| হীরা-৪ | ৬ | ভালো | ১৪০-১৫০ | ৫.৫-৬.৫ | চমৎকার |
| কালিজিরা | ৪ | মাঝারি | ১৫০-১৬০ | ২.৫-৩.৫ | অত্যন্ত ভালো |
| চিনিগুড়া | ৩ | মাঝারি | ১৪৫-১৫৫ | ৩.০-৪.০ | চমৎকার |
চাষাবাদ পদ্ধতি ও বিশেষ যত্ন
জমি প্রস্তুতি
সমন্বিত চাষাবাদের জন্য জমি প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জমিতে আইল তৈরি করে মাছ ও চিংড়ির জন্য পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হয়।
জমি প্রস্তুতির ধাপসমূহ:
- জমির চারপাশে ৩-৪ ফুট উঁচু আইল তৈরি করা
- জমির মাঝখানে ৩-৪ ফুট গভীর খাল খনন করা
- পানি নিকাশের জন্য পাইপ বা নালা তৈরি করা
- মাটির pH ৬.৫-৭.৫ এর মধ্যে রাখা
বীজ বপন ও চারা রোপণ
সমন্বিত চাষাবাদে সাধারণত চারা রোপণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কারণ সরাসরি বীজ বপন করলে মাছ ও চিংড়ি বীজ খেয়ে ফেলতে পারে।
চারা রোপণের নিয়ম:
- ২৫-৩০ দিন বয়সী চারা ব্যবহার করা
- ২০×১৫ সেন্টিমিটার দূরত্বে চারা রোপণ করা
- প্রতি গুছিতে ২-৩টি চারা রোপণ করা
- চারা রোপণের ১৫-২০ দিন পর মাছ ও চিংড়ি ছাড়া
পানি ব্যবস্থাপনা
পানি ব্যবস্থাপনা সমন্বিত চাষাবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। ধান, মাছ ও চিংড়ি তিনটির জন্যই উপযুক্ত পানির পরিমাণ ও গুণমান নিশ্চিত করতে হয়।
পানির গভীরতা:
- চারা রোপণের সময়: ৫-১০ সেন্টিমিটার
- চারা রোপণের ১৫ দিন পর: ২০-৩০ সেন্টিমিটার
- কুশি আসার সময়: ৩০-৪০ সেন্টিমিটার
- ধান পাকার সময়: ২০-২৫ সেন্টিমিটার
পানির গুণমান:
- লবণাক্ততা: জাত অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ
- pH: ৭.০-৮.৫
- দ্রবীভূত অক্সিজেন: ৪-৬ mg/L
- তাপমাত্রা: ২৫-৩২°C
সার প্রয়োগ
সমন্বিত চাষাবাদে সারের পরিমাণ সাধারণ ধান চাষের চেয়ে কিছুটা কম লাগে। কারণ মাছ ও চিংড়ির মলমূত্র প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করে।
সার প্রয়োগের হার (প্রতি হেক্টরে):
- ইউরিয়া: ২২০-২৫০ কেজি
- টিএসপি: ১২০-১৫০ কেজি
- এমওপি: ৮০-১০০ কেজি
- জিপসাম: ৬০-৮০ কেজি
- জিংক সালফেট: ৮-১০ কেজি
মাছ ও চিংড়ি ব্যবস্থাপনা
মাছের জাত নির্বাচন:
- রুই: ৩০-৪০%
- কাতলা: ২০-২৫%
- মৃগেল: ২০-২৫%
- সিলভার কার্প: ১৫-২০%
চিংড়ির জাত:
- গলদা চিংড়ি: প্রতি শতকে ৫০-৮০টি
- বাগদা চিংড়ি: প্রতি শতকে ৮০-১২০টি
মাছ ও চিংড়ি ছাড়ার নিয়ম:
- চারা রোপণের ১৫-২০ দিন পর মাছ ছাড়া
- চারা রোপণের ২৫-৩০ দিন পর চিংড়ি ছাড়া
- মাছ ও চিংড়ির পোনা ২-৩ ইঞ্চি সাইজের হতে হবে
রোগ ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা
প্রধান রোগসমূহ
ব্যাকটেরিয়াল ব্লাইট:
- লক্ষণ: পাতায় হলুদ দাগ, শিষ পচে যাওয়া
- প্রতিরোধ: প্রতিরোধী জাত ব্যবহার, সুষম সার প্রয়োগ
- চিকিৎসা: কপার সালফেট স্প্রে
ব্লাস্ট রোগ:
- লক্ষণ: পাতায় বাদামী দাগ, গলা পচা
- প্রতিরোধ: অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার পরিহার
- চিকিৎসা: ট্রাইসাইক্লাজোল স্প্রে
শিথ ব্লাইট:
- লক্ষণ: পাতার খোলে পানি ভেজা দাগ
- প্রতিরোধ: সুষম সার প্রয়োগ, পানির গভীরতা নিয়ন্ত্রণ
- চিকিৎসা: প্রোপিকোনাজোল স্প্রে
প্রধান পোকামাকড়
বাদামী গাছ ফড়িং:
- ক্ষতি: পাতার রস চুষে খায়
- প্রতিরোধ: প্রতিরোধী জাত ব্যবহার
- নিয়ন্ত্রণ: ইমিডাক্লোপ্রিড স্প্রে
পাতা মোড়ানো পোকা:
- ক্ষতি: পাতা মুড়িয়ে ভিতরের অংশ খায়
- প্রতিরোধ: পরিষ্কার চাষাবাদ
- নিয়ন্ত্রণ: ক্লোরান্ট্রানিলিপ্রোল স্প্রে
কাঁটাহাত পোকা:
- ক্ষতি: চারা গাছের কাণ্ড কেটে দেয়
- প্রতিরোধ: জমিতে পানি রাখা
- নিয়ন্ত্রণ: কার্বোফুরান প্রয়োগ
জৈব পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ
সমন্বিত চাষাবাদে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার সীমিত রাখা উচিত। কারণ এতে মাছ ও চিংড়ির ক্ষতি হতে পারে।
জৈব নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি:
- উপকারী পোকা সংরক্ষণ
- ট্রাইকোডার্মা ব্যবহার
- নিম তেল স্প্রে
- আলোর ফাঁদ ব্যবহার
- পার্চিং বা ডাল পোঁতা
ফসল সংগ্রহ ও বিপণন
ধান সংগ্রহ
ধান সংগ্রহের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। কারণ জমিতে মাছ ও চিংড়ি থাকে।
ধান সংগ্রহের নিয়ম:
- ধান পাকার ৮০-৮৫% পর্যায়ে কাটা
- সকালের দিকে ধান কাটা (শিশির থাকা অবস্থায়)
- মাছ ও চিংড়ি ধরার আগে ধান কাটা
- ধান কাটার সময় জমিতে পানি রাখা
মাছ ও চিংড়ি সংগ্রহ
মাছ সংগ্রহ:
- ধান কাটার ৫-৭ দিন পর মাছ ধরা
- জাল ব্যবহার করে মাছ ধরা
- বড় মাছ আলাদা করে ছোট মাছ ছেড়ে দেওয়া
চিংড়ি সংগ্রহ:
- নির্দিষ্ট আকারের চিংড়ি ধরা (৮-১০ পিস/কেজি)
- ছোট চিংড়ি পরবর্তী মৌসুমের জন্য রেখে দেওয়া
- রাতের বেলা চিংড়ি ধরা (অধিক সক্রিয় থাকে)
প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ
ধান প্রক্রিয়াকরণ:
- যথাযথভাবে শুকানো (১৪% আর্দ্রতা)
- পরিষ্কার চটের বস্তায় সংরক্ষণ
- গুদামজাতকরণের আগে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ
মাছ প্রক্রিয়াকরণ:
- তাজা অবস্থায় বিক্রয়
- বরফ দিয়ে সংরক্ষণ
- শুকানো বা লবণ দিয়ে সংরক্ষণ
চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণ:
- জীবন্ত অবস্থায় বিক্রয় (সর্বোচ্চ দাম)
- ঠান্ডা পানিতে সংরক্ষণ
- রপ্তানির জন্য প্রক্রিয়াকরণ
বিপণন কৌশল
স্থানীয় বাজার:
- সরাসরি ভোক্তাদের কাছে বিক্রয়
- স্থানীয় পাইকারি বাজারে বিক্রয়
- খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রয়
আঞ্চলিক বাজার:
- ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটে পাঠানো
- হোটেল-রেস্তোরাঁয় সরবরাহ
- সুপার শপে বিক্রয়
রপ্তানি বাজার:
- চিংড়ি রপ্তানির জন্য প্রক্রিয়াকরণ
- মান নিয়ন্ত্রণ ও সার্টিফিকেশন
- আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ
সমস্যা ও সমাধান
প্রধান সমস্যাসমূহ
পানির গুণমান সমস্যা:
- লবণাক্ততা বৃদ্ধি
- অক্সিজেনের অভাব
- pH এর তারতম্য
সমাধান:
- নিয়মিত পানির গুণমান পরীক্ষা
- প্রয়োজনে চুন প্রয়োগ
- বায়ু পাম্প ব্যবহার
মাছ ও চিংড়ির রোগ:
- ভাইরাল রোগ
- ব্যাকটেরিয়াল রোগ
- পরজীবীর আক্রমণ
সমাধান:
- স্বাস্থ্যকর পোনা ব্যবহার
- পানির গুণমান নিয়ন্ত্রণ
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
ধানের উৎপাদন কমে যাওয়া:
- পানির গভীরতা বেশি
- পুষ্টি উপাদানের অভাব
- আলোর অভাব
সমাধান:
- পানির গভীরতা নিয়ন্ত্রণ
- সুষম সার প্রয়োগ
- উন্নত জাত ব্যবহার
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস:
- আগাম সতর্কতা গ্রহণ
- জরুরি সংগ্রহের ব্যবস্থা
- পুনর্বাসনের পরিকল্পনা
অতিরিক্ত বৃষ্টি:
- পানি নিকাশের ব্যবস্থা
- জলমগ্নতা সহনশীল জাত ব্যবহার
- বিকল্প চাষাবাদ পদ্ধতি
খরা:
- পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা
- খরা সহনশীল জাত ব্যবহার
- সেচ ব্যবস্থার উন্নতি
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও উন্নয়ন
নতুন প্রযুক্তি
জিনগত প্রকৌশল:
- আরও উন্নত জাত উদ্ভাবন
- একাধিক প্রতিকূলতা সহনশীল জাত
- উচ্চ পুষ্টিগুণ সম্পন্ন জাত
স্মার্ট কৃষি:
- IoT ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ
- স্বয়ংক্রিয় সেচ ব্যবস্থা
- ড্রোন ভিত্তিক মনিটরিং
জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন:
- জলবায়ু সহনশীল জাত
- কার্বন নিউট্রাল চাষাবাদ
- পরিবেশ বান্ধব পদ্ধতি
সরকারি নীতি ও সহায়তা
গবেষণা ও উন্নয়ন:
- নতুন জাত উদ্ভাবনে বিনিয়োগ
- কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সম্প্রসারণ
- আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি
কৃষক সহায়তা:
- ভর্তুকি প্রদান
- ঋণ সুবিধা
- প্রশিক্ষণ কর্মসূচি
বাজার উন্নয়ন:
- রপ্তানি সুবিধা বৃদ্ধি
- মূল্য সংযোজন
- ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং
প্রত্যাশিত অগ্রগতি
২০৩০ সালের মধ্যে:
- ১০% বেশি উৎপাদনশীল জাত
- ৫০% বেশি লবণাক্ততা সহনশীল জাত
- ২০% কম পানি প্রয়োজন এমন জাত
২০৫০ সালের মধ্যে:
- সম্পূর্ণ জলবায়ু সহনশীল জাত
- স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থা
- টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন
প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন
কৃষক প্রশিক্ষণ
মৌলিক প্রশিক্ষণ:
- জাত নির্বাচন পদ্ধতি
- চাষাবাদ কৌশল
- পানি ব্যবস্থাপনা
উন্নত প্রশিক্ষণ:
- রোগবালাই ব্যবস্থাপনা
- বিপণন কৌশল
- হিসাব রক্ষণ
বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ:
- প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি
- রপ্তানি প্রক্রিয়া
- উদ্যোক্তা উন্নয়ন
প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান
সরকারি প্রতিষ্ঠান:
- কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
- ব্রি ও বিনা
- মৎস্য অধিদপ্তর
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান:
- NGO কর্মসূচি
- কৃষক সংগঠন
- সমবায় সমিতি
দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি
কৃষি কর্মী প্রশিক্ষণ:
- ডিপ্লোমা কোর্স
- সার্টিফিকেট কোর্স
- ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ
গবেষক প্রশিক্ষণ:
- স্নাতকোত্তর কোর্স
- পিএইচডি প্রোগ্রাম
- আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ
পরিবেশগত প্রভাব ও টেকসই উন্নয়ন
পরিবেশগত সুবিধা
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ:
- স্থানীয় মাছের প্রজাতি সংরক্ষণ
- পাখির আবাসস্থল তৈরি
- উদ্ভিদ বৈচিত্র্য বৃদ্ধি
মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন:
- জৈব পদার্থ বৃদ্ধি
- মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি
- ক্ষয়রোধ
পানি সংরক্ষণ:
- ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বৃদ্ধি
- বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ
- পানির গুণমান উন্নয়ন
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য
দারিদ্র্য বিমোচন:
- কৃষকের আয় বৃদ্ধি
- কর্মসংস্থান সৃষ্টি
- জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন
খাদ্য নিরাপত্তা:
- পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন
- খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতকরণ
- পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ
পরিবেশ সংরক্ষণ:
- কার্বন নিঃসরণ কমানো
- প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ
- জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ
খরচ-আয় বিশ্লেষণ
প্রাথমিক বিনিয়োগ (প্রতি বিঘা):
- জমি প্রস্তুতি: ৮,০০০-১০,০০০ টাকা
- বীজ ও চারা: ৩,০০০-৪,০০০ টাকা
- মাছ ও চিংড়ির পোনা: ৫,০০০-৭,০০০ টাকা
- সার ও কীটনাশক: ৪,০০০-৫,০০০ টাকা
মোট খরচ: ২০,০০০-২৬,০০০ টাকা
প্রত্যাশিত আয় (প্রতি বিঘা):
- ধান: ১৫,০০০-২০,০০০ টাকা
- মাছ: ২০,০০০-২৫,০০০ টাকা
- চিংড়ি: ১৫,০০০-২০,০০০ টাকা
মোট আয়: ৫০,০০০-৬৫,০০০ টাকা
নিট লাভ: ২৪,০০০-৩৯,০০০ টাকা
বিনিয়োগ ফেরত সময়
সমন্বিত চাষাবাদে প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রথম বছরেই ফেরত পাওয়া সম্ভব। তবে দ্বিতীয় বছর থেকে খরচ কমে যায় কারণ জমি প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় না।
দ্বিতীয় বছরের খরচ (প্রতি বিঘা):
- বীজ ও চারা: ৩,০০০-৪,০০০ টাকা
- মাছ ও চিংড়ির পোনা: ৩,০০০-৪,০০০ টাকা (কিছু আগের বছরের থেকে যায়)
- সার ও কীটনাশক: ৩,৫০০-৪,৫০০ টাকা
- শ্রম খরচ: ৪,০০০-৫,০০০ টাকা
মোট খরচ: ১৩,৫০০-১৭,৫০০ টাকা নিট লাভ: ৩৬,৫০০-৪৭,৫০০ টাকা
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
প্রাকৃতিক ঝুঁকি:
- বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়
- খরা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি
- রোগবালাইয়ের প্রকোপ
বাজার ঝুঁকি:
- দাম কমে যাওয়া
- চাহিদা হ্রাস
- পরিবহন সমস্যা
ঝুঁকি কমানোর উপায়:
- কৃষি বীমা গ্রহণ
- বিভিন্ন ফসলে বিনিয়োগ
- সঞ্চয় ও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. কোন ধানের জাত সবচেয়ে বেশি লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে?
বিনাধান-৮ সবচেয়ে বেশি লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। এই জাতটি ১২ ডেসিসিমেন্স প্রতি মিটার পর্যন্ত লবণাক্ততায় ভালো ফলন দিতে পারে। এর পরেই রয়েছে বিনাধান-১০ যা ১০ ডেসিসিমেন্স প্রতি মিটার পর্যন্ত সহ্য করতে পারে।
২. সমন্বিত চাষাবাদে কত গভীর পানি রাখতে হয়?
সমন্বিত চাষাবাদে সাধারণত ৩০-৬০ সেন্টিমিটার গভীর পানি রাখতে হয়। তবে ধানের বৃদ্ধির বিভিন্ন পর্যায়ে পানির গভীরতা পরিবর্তন করতে হয়। চারা রোপণের সময় ৫-১০ সেন্টিমিটার এবং কুশি আসার সময় ৩০-৪০ সেন্টিমিটার রাখা উত্তম।
৩. একসাথে কত ধরনের মাছ ছাড়া যায়?
সাধারণত ৪-৫ ধরনের মাছ একসাথে ছাড়া যায়। যেমন রুই ৩০-৪০%, কাতলা ২০-২৫%, মৃগেল ২০-২৫%, সিলভার কার্প ১৫-২০% এবং কমন কার্প ৫-১০% অনুপাতে ছাড়া যেতে পারে। এতে পানির বিভিন্ন স্তরের খাদ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার হয়।
৪. কোন সময় চারা রোপণ করা সবচেয়ে ভালো?
আমন মৌসুমে জুলাই-আগস্ট মাসে চারা রোপণ করা সবচেয়ে ভালো। এই সময় বৃষ্টিপাত বেশি থাকে এবং প্রাকৃতিকভাবে পানির জোগান পাওয়া যায়। বোরো মৌসুমে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে রোপণ করা যায় তবে সেচের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৫. রাসায়নিক সার কতটুকু কম লাগে?
সমন্বিত চাষাবাদে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ৩০-৪০% কম লাগে। কারণ মাছ ও চিংড়ির মলমূত্র প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করে। বিশেষভাবে নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের চাহিদা অনেক কমে যায়।
৬. কোন জাত দিয়ে শুরু করা ভালো?
নতুন চাষিদের জন্য বিআর৪৭ বা বিনাধান-১০ দিয়ে শুরু করা ভালো। এই জাতগুলো চাষাবাদে সহজ, রোগ প্রতিরোধী এবং বাজারে চাহিদা ভালো। অভিজ্ঞতা অর্জনের পর উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড জাত ব্যবহার করা যেতে পারে।
৭. চিংড়ি ও মাছ কি ধানের ক্ষতি করে?
না, বরং চিংড়ি ও মাছ ধানের উপকার করে। এরা ধানের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে জৈবিক কীটনাশকের কাজ করে। তবে রোপণের প্রথম ১৫-২০ দিন মাছ ও চিংড়ি না ছাড়াই ভালো, যাতে চারা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
৮. বন্যার সময় কী করণীয়?
বন্যার সময় জলমগ্নতা সহনশীল জাত যেমন স্বর্ণা বা দশমিনা চাষ করা উচিত। এই জাতগুলো ১৪ দিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ পানিতে ডুবে থাকতে পারে। বন্যার পানি নেমে গেলে দ্রুত পরিচর্যা নিতে হবে এবং প্রয়োজনে উপরি সার প্রয়োগ করতে হবে।
৯. হাইব্রিড জাতের বীজ কোথায় পাওয়া যায়?
হাইব্রিড জাতের বীজ সরকারি বীজ ভান্ডার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অফিস এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত বীজ ব্যবসায়ীদের কাছে পাওয়া যায়। তবে অবশ্যই সার্টিফাইড বীজ কিনতে হবে এবং প্যাকেটের গায়ে মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ দেখে নিতে হবে।
১০. রপ্তানি করার জন্য কী ধরনের প্রক্রিয়াকরণ প্রয়োজন?
রপ্তানির জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় প্রক্রিয়াকরণ করতে হয়। চিংড়ির ক্ষেত্রে হ্যাকপ (HACCP) সার্টিফিকেশন প্রয়োজন। ধানের ক্ষেত্রে জৈব সার্টিফিকেশন পেলে রপ্তানি দাম বেশি পাওয়া যায়। স্থানীয় রপ্তানিকারকদের সাথে যোগাযোগ করে চুক্তিবদ্ধ চাষাবাদ করা যেতে পারে।
উপসংহার
ধানের সাথে মাছ ও চিংড়ি চাষের জন্য সঠিক ধানের জাত নির্বাচন সফলতার মূল চাবিকাঠি। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় এই সমন্বিত চাষাবাদ পদ্ধতি একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন যা কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটিয়েছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
লবণাক্ততা ও জলমগ্নতা সহনশীল জাতগুলোর মধ্যে বিনাধান-৮, বিনাধান-১০, বিআর৪৭, স্বর্ণা এবং হাইব্রিড জাত হীরা-৪ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই জাতগুলো শুধুমাত্র প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারে না, বরং ভালো ফলনও দিতে সক্ষম।
সমন্বিত চাষাবাদ পদ্ধতিতে একজন কৃষক একই জমি থেকে ধান, মাছ ও চিংড়ি তিনটি ফসলই পেতে পারেন। এতে তার আয় তিনগুণ বৃদ্ধি পায় এবং ঝুঁকি কমে যায়। পরিবেশগত দিক থেকেও এই পদ্ধতি অত্যন্ত উপকারী কারণ রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমে যায়।
তবে এই পদ্ধতিতে সফল হতে হলে সঠিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। বিশেষভাবে পানির গুণমান ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক সময়ে ফসল সংগ্রহের বিষয়ে জানতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি রয়েছে যেগুলোতে অংশগ্রহণ করে এই দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব।
ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা আরও বৃদ্ধি পাবে। এই পরিস্থিতিতে সমন্বিত চাষাবাদ এবং সহনশীল ধানের জাত ব্যবহার আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যেই আরও উন্নত ও সহনশীল জাত উদ্ভাবনের কাজ করছে।
সমন্বিত চাষাবাদের মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি রপ্তানিতেও অবদান রাখতে পারে। বিশেষভাবে চিংড়ি রপ্তানিতে বাংলাদেশের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত ধান, মাছ ও চিংড়ির চাহিদা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, সঠিক ধানের জাত নির্বাচন ও বিজ্ঞানসম্মত চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ করে সমন্বিত চাষাবাদের মাধ্যমে কৃষকরা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারেন। এই পদ্ধতি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত লাভজনক নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতি ও পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এই পদ্ধতির আরও ব্যাপক প্রসার ঘটানো প্রয়োজন।