সরষে ইলিশ রান্নার সহজ রেসিপি: ঘরোয়া পদ্ধতিতে ধাপে ধাপে
ইলিশ মাছের নানা পদের মধ্যে সরষে ইলিশ বাঙালির খুব পরিচিত ও প্রিয় একটি পদ। সরষের ঝাঁঝ আর কাঁচা মরিচের গন্ধে ইলিশের নিজস্ব স্বাদ আরও খুলে যায়। রান্নাটি খুব কঠিন নয়, তবে কিছু ছোট বিষয় খেয়াল না রাখলে সরষে তেতো হয়ে যেতে পারে। এই লেখায় ঘরোয়া পদ্ধতিতে ধাপে ধাপে রান্নার নিয়ম দেওয়া হলো।
রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ
চার-পাঁচ জনের জন্য মোটামুটি এই উপকরণগুলো লাগবে। আপনার রুচি অনুযায়ী পরিমাণ কমবেশি করে নিতে পারেন।
- ইলিশ মাছের টুকরা: ৬ থেকে ৮ টুকরা
- কালো সরষে ও হলুদ সরষে মিলিয়ে: প্রায় দুই টেবিল চামচ
- কাঁচা মরিচ: ৫-৬টি (ঝাল অনুযায়ী)
- সরষের তেল: তিন-চার টেবিল চামচ
- হলুদ গুঁড়া: আধা চা চামচ
- লবণ: স্বাদমতো
- পানি: আধা কাপের মতো
- চাইলে সামান্য কালোজিরা
ভালো ইলিশ বেছে নেওয়া
যেকোনো রান্নার স্বাদ অনেকটাই মাছের তাজাতার ওপর নির্ভর করে। বাজারে ইলিশ কেনার সময় চোখ, ফুলকা, আঁশ ও গন্ধ দেখে বেছে নিন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ভালো ইলিশ চেনার উপায় লেখাটি দেখে নিতে পারেন। মাছ বেশি বড় হলে টুকরার পুরু অংশ ভেতরে কাঁচা থেকে যেতে পারে, তাই মাঝারি আকারের টুকরা এই রান্নায় বেশি ভালো।
মাছ প্রস্তুত করার নিয়ম
মাছ ভালোভাবে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন। ইলিশের আঁশ সাধারণত হালকা করে ছাড়ানো হয় বা রান্নার আগে পরিষ্কার করে নেওয়া হয়। এরপর টুকরাগুলোতে সামান্য লবণ ও হলুদ মাখিয়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিট রেখে দিন। এতে মাছের স্বাদ ভেতরে ঢোকে এবং রান্নার সময় টুকরা ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে।
ফ্রিজে রাখা মাছ হলে আগে নিয়ম মেনে গলিয়ে নিন। কীভাবে নিরাপদে গলাবেন, তা জানতে ফ্রিজে মাছ সংরক্ষণের সঠিক নিয়ম লেখাটি কাজে আসবে।
সরষের পেস্ট তৈরি
এটাই এই রান্নার সবচেয়ে সূক্ষ্ম অংশ। সরষে বেশি সময় ধরে বাটলে বা গরম হয়ে গেলে তেতো স্বাদ আসে। তাই কয়েকটি বিষয় মনে রাখুন:
- সরষে আগে অল্প গরম পানিতে বা ঠান্ডা পানিতে ২০-৩০ মিনিট ভিজিয়ে নিন।
- ভিজানো সরষের সঙ্গে কাঁচা মরিচ ও সামান্য লবণ মিলিয়ে ব্লেন্ডারে অল্প সময় ঘুরিয়ে নিন।
- বেশি সময় ধরে ব্লেন্ড করবেন না, এতে ব্লেন্ডার গরম হয়ে পেস্ট তেতো হতে পারে।
- পেস্টে সামান্য ঠান্ডা পানি মিশিয়ে ঘন-তরল অবস্থায় রাখুন।
শিল-পাটায় বাটলে স্বাদ আরও ভালো হয় বলে অনেকে মনে করেন, তবে ব্লেন্ডারেও চমৎকার ফল পাওয়া যায়।
ধাপে ধাপে রান্নার পদ্ধতি
- কড়াইয়ে বা ননস্টিক পাত্রে সামান্য সরষের তেল গরম করে মাছের টুকরাগুলো হালকা করে ভেজে নিন। এতে আমিষ গন্ধ কমে। বেশি ভাজার দরকার নেই, দুই পাশ হালকা সাদাটে হলেই যথেষ্ট।
- অন্য একটি পাত্রে বাকি তেল দিন। তেল খুব বেশি গরম করবেন না, হালকা গরম হলেই চলবে।
- চাইলে সামান্য কালোজিরা ও কয়েকটি কাঁচা মরিচ দিয়ে নাড়ুন।
- সরষের পেস্ট ঢেলে আঁচ কমিয়ে হলুদ ও স্বাদমতো লবণ দিন। কয়েক মিনিট হালকা নাড়ুন, তবে বেশি সময় কষাবেন না।
- আধা কাপ পানি দিয়ে ফুটে উঠলে ভাজা মাছের টুকরাগুলো ধীরে ধীরে বসান।
- পাত্র ঢেকে মৃদু আঁচে ৮ থেকে ১০ মিনিট রান্না করুন। মাছ নাড়ার সময় চামচ না দিয়ে পাত্র হালকা ঘুরিয়ে নাড়ালে টুকরা ভাঙবে না।
- ঝোল ঘন হয়ে এলে ওপরে আবার কয়েকটি কাঁচা মরিচ ও সামান্য সরষের তেল ছড়িয়ে নামিয়ে নিন।
স্বাদ ঠিক রাখার কিছু টিপস
- সরষে বেশি জ্বালে দিলে তেতো হয়, তাই রান্না অল্প সময়ে ও মৃদু আঁচে শেষ করুন।
- কাঁচা মরিচ আস্ত রাখলে ঝাল ও সুগন্ধ দুটোই পাওয়া যায়।
- পাত্র ঢেকে রান্না করলে মাছ ভেতর পর্যন্ত সেদ্ধ হয়।
- রান্নার পর অন্তত ১০ মিনিট ঢেকে রাখলে মশলার স্বাদ মাছের ভেতরে ভালো করে বসে।
বিকল্প পদ্ধতি: ভাপা সরষে ইলিশ
তেল কম খেতে চাইলে বা ঝামেলা কম চাইলে ভাপা পদ্ধতিতে রান্না করা যায়। এতে মাছের টুকরায় সরষের পেস্ট, তেল, লবণ ও কাঁচা মরিচ মাখিয়ে ঢাকনাযুক্ত একটি বাটিতে ভরে ভাতের ওপর বা ভাপে সেদ্ধ করে নেওয়া হয়। এতে মাছ নরম ও সুগন্ধযুক্ত থাকে এবং আলাদা ভাজার প্রয়োজন হয় না।
পরিবেশন ও সঙ্গের খাবার
সরষে ইলিশ সবচেয়ে ভালো লাগে গরম সাদা ভাতের সঙ্গে। ভাতের ওপর একটু ঝোল ঢেলে মেখে খেলে সরষের ঝাঁঝ আর ইলিশের তেলের স্বাদ একসঙ্গে পাওয়া যায়। সঙ্গে ভাজা শুকনো মরিচ, কাঁচা পেঁয়াজ বা লেবুর টুকরা রাখলে স্বাদ আরও জমে ওঠে। অনেকে সঙ্গে সাধারণ ডাল বা আলু ভর্তাও রাখেন, যা পদটির তীব্রতা কিছুটা সামলে দেয়।
রান্নার পর মাছ বেশি সময় গরম অবস্থায় না রেখে সম্ভব হলে সেদিনই খেয়ে ফেলুন। রাখতে হলে ঠান্ডা হওয়ার পর ঢেকে ফ্রিজে রাখুন এবং পরদিন ভালোভাবে গরম করে নিন। সরষের পদ একদিনের বেশি রাখলে স্বাদ কিছুটা বদলে যেতে পারে।
ইলিশের টুকরা কাটার ও কাঁটা সামলানোর কিছু কথা
ইলিশে কাঁটা বেশি বলে টুকরার আকার ঠিক রাখা জরুরি। খুব পাতলা টুকরা হলে রান্নার সময় ভেঙে যায়, আবার অতি মোটা হলে ভেতরে সেদ্ধ হতে সময় লাগে। বাজার থেকে কেনার সময় মাছওয়ালাকে মাঝারি পুরুত্বের টুকরা করে দিতে বলুন। মাছের পেটের অংশ সাধারণত বেশি তেলযুক্ত ও নরম হয়, আর পিঠের অংশে মাংস বেশি থাকে। দুই রকম টুকরাই রান্নায় রাখলে সবার পছন্দ মেটে।
খাওয়ার সময় ধীরে ও সাবধানে কাঁটা বেছে নিন। গলায় কাঁটা আটকে গেলে নিজে জোর করে ভাত গিলে ফেলার চেষ্টা না করে প্রয়োজনে দ্রুত স্বাস্থ্যকর্মীর সাহায্য নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সরষে ইলিশ তেতো লাগলে কী করব?
সাধারণত সরষে বেশি সময় বাটলে বা বেশি তাপে রান্না করলে এমন হয়। পরের বার সরষে ভিজিয়ে অল্প সময়ে ব্লেন্ড করুন এবং কম আঁচে রান্না করুন।
হিমায়িত ইলিশ দিয়ে কি এই পদ রান্না করা যায়?
হ্যাঁ, ঠিকভাবে গলিয়ে নিলে করা যায়। তবে তাজা মাছের স্বাদ ও গড়ন সাধারণত একটু ভালো হয়।
কাঁটা বেশি বলে বাচ্চাদের কীভাবে দেব?
বাচ্চাদের দেওয়ার আগে বড়দের কাউকে মাছ থেকে কাঁটা বেছে নিতে হবে। পাতলা ঝোল দিয়ে ভাত মেখে অল্প অল্প করে খাওয়ানো ভালো এবং খাওয়ার সময় তাদের কাছে থাকা দরকার।
সারসংক্ষেপ
সরষে ইলিশের সাফল্য নির্ভর করে তাজা মাছ, সঠিকভাবে বাটা সরষে এবং কম সময়ের মৃদু আঁচের রান্নার ওপর। ধাপগুলো মেনে চললে ঘরেই রেস্তোরাঁর মতো স্বাদ পাওয়া সম্ভব। একবার চেষ্টা করে নিজের রুচি অনুযায়ী ঝাল ও লবণের পরিমাণ ঠিক করে নিন।